বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে গত ৩০ আগস্ট জানিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে শুরু হবে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে। প্রায় দুই লাখ শ্রমিকের মধ্যে ১০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া বিনা খরচে নেবে বলেও জানান তিনি।
গত ৩০ আগস্ট সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহদা বিন ওসমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে (১- ২- ৩) বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ শ্রমিক নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। বিএনপি মিডিয়া সেলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও এ-সংক্রান্ত পোস্ট করা হয়।
তবে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রেস রিলিজ প্রকাশ করে। এতে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির সুযোগ, মেডিক্যাল সেন্টার এবং কর্মীদের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।
একই বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই ‘জিরো-কস্টে’ মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা জানানো হয়। তবে সেখানে আগামী ছয় মাসে দুই লাখ শ্রমিক নেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
২ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার ইংরেজি সংবাদমাধ্যম New Straits Times (NST) মীর শাহে আলমের বক্তব্যের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিলের বক্তব্য প্রকাশ করে।
ফাহমি জানান, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর. রামানন তাঁকে বলেছেন, বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রী এই বক্তব্য দিয়েছেন এবং এটিকে বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল ঘোষণা বা অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। অর্থাৎ, দুই লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা উচিত নয় বলে তিনি জানান।
NST-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শ্রমিক শোষণ, ঋণবন্দিত্ব, জোরপূর্বক শ্রম এবং প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ার মতো বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া ২০২৪ সালে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ সীমিত করেছিল। পাশাপাশি, বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির মোট কর্মশক্তিতে বিদেশি শ্রমিকের হার প্রায় ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অতএব, বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রী নির্দিষ্ট তথ্য দিলেও, NST-তে প্রকাশিত মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র সেই বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আগের দাবির বিষয়ে নতুন কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, বর্তমানে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ এবং ১০ হাজার কর্মীকে জিরো-কস্টে পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য রয়েছে। কিন্তু আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক নেওয়ার যে নির্দিষ্ট তথ্য প্রতিমন্ত্রী ৩০ আগস্ট দিয়েছেন, সেটিকে বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না বলে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।