মিথ্যা (False)

বাংলাদেশে হিন্দু তরুণীকে যৌন নির্যাতনের দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার

M

Mahfuz Hamdan

মিথ্যা (False)
বাংলাদেশে হিন্দু তরুণীকে যৌন নির্যাতনের দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘India First Post’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, এতে একজন বাংলাদেশি হিন্দু তরুণী তার ওপর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং পাশে বসে থাকা তার বাবা কাঁদছেন। 


ভিডিওতে জনৈক নারীকে তার কান্নাভেজা কন্ঠে তার উপর হওয়া নির্যাতনের বিবরণ দিতে দেখা যায়। পোস্টে আরও বলা হয় “বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের কখনো কখনো এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়ের ক্ষেত্রে নীরব না থেকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।”


তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত দাবিটি সঠিক নয়। ভিডিওটি যৌন নির্যাতনের কোনো ঘটনার নয়, বরং কিস্তির টাকা পরিশোধে বিলম্বকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় এক হিন্দু দম্পতিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগের ঘটনার ভিডিও।


ভিডিওটির কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করে বাংলাদেশি ফেসবুক পেজ ‘Dristikon’-এ এর মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। ১৫ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত ওই ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, ‘কিস্তির টাকা না পেয়ে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করলো এনজিও কর্মী’। পরবর্তীতে ‘Cumilla Pratidin’ নামের স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমেও একই ঘটনার ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখানে ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘কিস্তি না দেয়ায় কুমিল্লায় হিন্দু দম্পতিকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ’।


ঘটনাটি নিয়ে ‘Cumilla Pratidin’-এ ১৩ মে ২০২৬ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লা শহরের সদর গোয়ালপট্টি এলাকায় কিস্তির টাকা পরিশোধে বিলম্বকে কেন্দ্র করে বেসরকারি সংস্থা ‘পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি’র কয়েকজন মাঠকর্মীর বিরুদ্ধে এক হিন্দু দম্পতিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় জিম্মাদারসহ চারজনের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শ্যামল চন্দ্র সরকার।


প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিনা রানী সাহা ‘পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি’ থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিতভাবে মাসে ৮ হাজার টাকা করে ছয়টি কিস্তি পরিশোধ করলেও পরবর্তী তিনটি কিস্তি সময়মতো দিতে পারেননি।


অভিযোগে বলা হয়, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে সংস্থাটির মাঠকর্মী মিরাজ হোসেন, রাহিদ, ইতি দেবনাথ ও রোকসানা আক্তার গোয়ালপট্টি এলাকায় ওই দম্পতির ভাড়া বাসায় যান। এ সময় দম্পতি পরবর্তী মাস থেকে বকেয়া কিস্তি পরিশোধের আশ্বাস দিলেও অভিযুক্তরা তা না মেনে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ইতি দেবনাথ ও রোকসানা আক্তার রিনা রানী সাহাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে অভিযোগ করা হয়। স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে শ্যামল চন্দ্র সরকারকেও মারধর করা হয়।


এছাড়া অভিযোগে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই দম্পতির পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন এবং রিনা রানী সাহার শাখা ভেঙে দেন। পরে আশপাশের লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করেন। ঘটনার রাতেই কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।


অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওটি ওই দম্পতির থানায় অভিযোগ করার সময় ধারণ করা। ভিডিওতে যে নারীকে কান্নাভেজা কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দিতে দেখা যায়, তিনি রিনা রানী সাহা। আর তার পাশে থাকা পুরুষটি তার বাবা নন, তিনি তার স্বামী শ্যামল চন্দ্র সরকার।


অর্থাৎ, ‘বাংলাদেশি হিন্দু তরুণী তার ওপর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছেন এবং পাশে তার বাবা কাঁদছেন’ এই দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি প্রকৃতপক্ষে কুমিল্লায় কিস্তির টাকা পরিশোধে বিলম্বকে কেন্দ্র করে এক হিন্দু দম্পতিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগের ঘটনার ভিডিও। ভিডিওটির সঙ্গে যৌন নির্যাতনের দাবিটি সম্পূর্ণ অসঙ্গত এবং ভুল প্রেক্ষাপটে প্রচার করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র (Sources & References)

আরও পড়ুন