⚠️ বিভ্রান্তিকর (Misleading)

সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানোর দাবি রুমিন ফারহানার, তথ্যটি সঠিক নয়

M

Mahfuz Hamdan

⚠️ বিভ্রান্তিকর (Misleading)
সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানোর দাবি রুমিন ফারহানার, তথ্যটি সঠিক নয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন গতকাল ২৭ আগস্ট সংসদে বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বক্তব্যে তিনি দেশের কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দাবি করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং ৯ শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।


রুমিন ফারহানা বলেন, “যখন তেলের দাম বাড়ছে, যখন বিদ্যুতের জন্য হাহাকার, যখন গ্যাস পাওয়া যায় না, তখন এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে যে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নির্বাচনে, সেই সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে ৬২ হাজার লোক তাদের চাকরি হারিয়েছে। আর নয়শোর উপরে কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।”


তবে যাচাই করে দেখা যায়, তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানোর তথ্যটি বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং এ তথ্যটি সম্প্রতি একটি ভুল তথ্যের সূত্র ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল।


গত ২৪ আগস্ট বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি সংলাপ আয়োজন করে। সেখানে উপস্থাপিত প্রতিবেদনের ১১ নম্বর স্লাইডে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী এই তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মহীন হয়েছেন।


সিপিডির ওই তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও ৯৫টি কারখানা বন্ধ ও প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিকের কর্মহীন হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।


তবে সিপিডির উপস্থাপনার পর এই তথ্যের সময়কাল নিয়ে প্রথম অসংগতি শনাক্ত করে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট। ২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ডিসেন্ট দেখায়, সিপিডির দেওয়া ৯৫টি কারখানা বন্ধ এবং ৬১ হাজার ৮৮১ জনের চাকরি হারানোর সংখ্যা হুবহু মিলে যায় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে।


প্রথম আলো ২০২৫ সালের ৫ মার্চ ‘তিন শিল্প এলাকায় সাত মাসে বন্ধ ৯৫ কারখানা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদনে শিল্প পুলিশের তথ্যের বরাতে বলা হয়, আগের সাত মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং এসব কারখানায় কর্মরত ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন।


অর্থাৎ, ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিকের চাকরি হারানোর তথ্যটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ের নয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ৫ মার্চ এবং সেখানে ‘বিগত সাত মাস’ বলতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে বোঝানো হয়েছিল।


পরে সিপিডি নিজেই তথ্যগত বিভ্রান্তির বিষয়টি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, তাদের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যটি ২২ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই তথ্যের মূল উৎস যাচাই করা হয়নি। পরে দেখা যায়, ঢাকা ট্রিবিউনের ওই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সময়কাল পরিবর্তন করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর ফলেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ঢাকা ট্রিবিউন পরে প্রতিবেদনটি সংশোধন করে।


সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক অভ্র ভট্টাচার্যের সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, অসাবধানতাবশত এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় তারা দুঃখিত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের তথ্যগত বিভ্রান্তি এড়াতে গবেষণা দল আরও সতর্ক থাকবে। একই সঙ্গে সিপিডি জানায়, শিল্পকারখানা বন্ধ ও শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও তাদের নেতাদের বক্তব্যের কারণে বিষয়টি তাদের পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।


অন্যদিকে, রুমিন ফারহানার বক্তব্যে ৯ শতাধিক কারখানা বন্ধ হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে ৬২ হাজার শ্রমিকের তথ্যের মতো একই ধরনের ভুল উৎস পাওয়া যায়নি। ১৯ আগস্ট দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের বক্তব্যের বরাতে বলা হয়, সংগঠনটির ১ হাজার ৮০০-এর বেশি সদস্য মিলের মধ্যে ৯০০-এর বেশি টেক্সটাইল মিল গ্যাস সরবরাহের বিঘ্নের কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে গ্যাস সংকটে ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা বলা হয়।


তবে এই ৯০০-এর বেশি মিল বন্ধ থাকার সংখ্যাটি বিটিএমএ সভাপতির বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে এ সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি যেমন কোনো জরিপ, সদস্যদের দেওয়া তথ্য, নাকি অন্য কোনো হিসাব সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। একইভাবে, এই সংখ্যাটি সরকার বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত বা খণ্ডন করা হয়েছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।


ফলে, রুমিন ফারহানার বক্তব্যের ‘ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন’, এই দাবিটি সঠিক নয়। কারণ তিনি যে সংখ্যাটিকে বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন, সেই ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিকের তথ্য মূলত ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি সময়ের কারখানা বন্ধের ঘটনা থেকে এসেছে এবং সিপিডিও পরবর্তীতে তাদের প্রতিবেদনে এই তথ্য ব্যবহারে ভুলের কথা স্বীকার করেছে।


অন্যদিকে, ৯ শতাধিক কারখানা বন্ধের দাবিটি একটি শিল্প সংগঠনের সভাপতির বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, এর পরিসর ও হিসাবের পদ্ধতি স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এ অংশটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।


সার্বিকভাবে, রুমিন ফারহানার বক্তব্যে ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানোর তথ্যটি ভুল সময়কালের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে যুক্ত করে বলা হয়েছে। আর ৯ শতাধিক কারখানা বন্ধের দাবিটির ক্ষেত্রে শিল্প খাতের একটি সংগঠনের দেওয়া তথ্য পাওয়া গেলেও সংখ্যাটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি।

তথ্যসূত্র (Sources & References)

আরও পড়ুন